কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা অফিসারকে স্যার/ম্যাডাম না ডাকার কারণে কিংবা ভাই বা আপা ডাকার কারণে সাধারণ জনগণ বা সেবাগ্রহীতা কাউকে বকা দেওয়া হয়েছে বা অপমান করা হয়েছে—এই ধরনের অভিযোগ প্রায়ই আমরা শুনি এবং সংবাদমাধ্যমে জানতে পারি। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য, যারা স্যার/ম্যাডাম শুনতে চান তারা কি জোর করেন, নাকি যারা বলেন না তারা অবহেলা করেন?
‘জনাব’ শব্দের অর্থ হলো জনাব, মহাশয়, মহোদয়, মাননীয়, ভদ্রলোক বা সম্মানসূচক সম্বোধন। ইংরেজি ভাষায় ‘Mr.’ বা বাংলায় ‘শ্রী’ ও ‘সাহেব’ শব্দের পরিবর্তে সম্মান দেখানোর জন্য কোনো ব্যক্তির নামের আগে এটি ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত একটি আরবি শব্দ। আরবি ‘জনাব’ থেকে শব্দটি এসেছে। ‘মহোদয়’ ও ‘মহাশয়’ শব্দ দুটি বাংলায় আবেদন লেখার ক্ষেত্রে নাম ও পদবি উভয়ের পূর্বে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত হয়। তবে এই ক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত, নিজে অন্য কারো কাছে যখন নিজের নাম বলা হয়, তখন ‘জনাব’ বা ‘স্যার’ ব্যবহার করা যাবে না।
স্যার, ম্যাডাম, জনাব, মহাশয়, মহোদয়, মাননীয়, ভদ্রলোক ইত্যাদি শব্দ কমবেশি সম্মানসূচক সম্বোধন করার জন্যই ব্যবহার করা হয়। তবে পরিবার এবং সমাজে স্বাভাবিক আলোচনায় আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহার করি না। পরিবার এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলায় আমরা কাউকে ‘আপনি’, কাউকে ‘তুমি’ কিংবা ‘তুই’ ডাকি। সাধারণত বয়সে বড়, অচেনা/অজানা ব্যক্তির ক্ষেত্রে সম্বোধনে আমরা ‘আপনি’ শব্দটি ব্যবহার করি। খুব কাছের কারো জন্য বা একই বয়সের কারো সাথে ‘তুমি’। বয়সে ছোট বা কাছের বন্ধুবান্ধবদের আমরা ‘তুই’ ডাকি। মানে সামাজিক জীবনে সম্মানজনক সম্বোধনের একটা চল আছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বাংলাদেশে ‘কর্মচারী’ এবং ‘কর্মকর্তা’—এই রকম দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়, যদিও সবাই সরকার দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তাদের বেতন হয় জনগণের দেওয়া ট্যাক্স থেকে। এক্ষেত্রে যারা সরকারি চাকরি করেন তারাও ট্যাক্স দেন, এটাও সত্যি। অনেক সময় ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায়…’ এই ধরনের মন্তব্য যাদের উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন ধারণা করা হয় তারা (যাদের বলা হয়) হয়তো ট্যাক্স দেন না। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। ট্যাক্স সরকারি সেবাগ্রহীতা এবং সেবাদানকারী উভয়ই দেন।
মূলত কাউকে দিয়ে জোর করে স্যার/ম্যাডাম ডাকানো সম্ভব না। তবে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যিনি সেবা নিচ্ছেন তাকে যদি ‘তুই-তোকারি’ করা হয়, তাহলে তিনি অপমান বোধ করেন। তার মানে সম্বোধন ব্যাপারটা নিয়ে সবাই কমবেশি সচেতন, কিন্তু হরেদরে সবাইকে ভাই বা নারী হলে আপা ডাকা সাধারণ অভ্যাস।
আমাদের সমাজে কর্ম দুই প্রকার—একটি শারীরিক শ্রম আর অন্যটি মেধাভিত্তিক শ্রম। যদিও মেধাভিত্তিক শ্রম যারা দেন তাদের শারীরিক শ্রমও দেওয়া লাগে বৈকি। যিনি মেধাভিত্তিক সেবা দেন তিনি চাইলে শ্রমভিত্তিক কর্ম করতে পারেন, কিন্তু যিনি শ্রমভিত্তিক কর্ম করছেন তিনি চাইলেই মেধাভিত্তিক কাজ করতে পারেন না। ধরে নিচ্ছি, শ্রমভিত্তিক কাজ যারা করেন তারা লেখাপড়া করেননি বা বেশি করেননি। বিশ্বব্যাপী শ্রমভিত্তিক পেশার চেয়ে মেধাভিত্তিক পেশার সম্মান বেশি, বেতনও বেশি।
একটি হাসপাতালে নিরাপত্তাকর্মী, আয়া/বয়, নার্স, ডাক্তার ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকেন। এখন আপনি যদি সবাইকে ভাই/আপা ডাকেন তাহলে কেমন দেখায়? যদিও ধরে নিচ্ছি সবাইকে হরেদরে ভাই/আপা ডাকা হলেও তা কাউকে অসম্মান করার উদ্দেশ্যে করা হয় না, কিন্তু তাতে তো সম্মানও দেওয়া হয় না। আমরা পরিবার এবং সামাজিক জীবনে কিন্তু সচেতনভাবে বড়কে ‘আপনি’ ডাকছি। তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাকে স্যার/ম্যাডাম ডাকাতে কি সাধারণের অবহেলাও আছে?
জোর করে স্যার/ম্যাডাম ডাকানো যায় না, কিন্তু মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো কিছু কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে কি স্বপ্রণোদিত হয়েই সেবাগ্রহীতা সেবাদাতাকে স্যার/ম্যাডাম বলেন না? উদাহরণ হিসেবে বলা যায় থানা বা পুলিশ প্রশাসনের অফিসগুলোতে। কারো কাছ থেকে জোর করে স্যার/ম্যাডাম ডাক শুনে যেমন সম্মান পাওয়া সম্ভব না, তেমনি কাউকে সম্মান না দেওয়ার প্রবণতাও ভালো কিছু না।
অন্য একটি বিষয়, একজন সরকারি সেবাদাতা বা কর্মকর্তাও সেবাগ্রহীতাকে স্যার/ম্যাডাম ডাকতে পারেন। মানে সম্মান শুধু পাওয়ার বিষয় নয়, সম্মান দেওয়ারও বিষয়। সরকারি চাকুরে মানে আপনার বাড়ির চাকর নয়—এটাও মাথায় রাখা উচিত।
সবুজ কুন্ডু
ফাউন্ডার এন্ড সিইও, কোডবক্সার
১৫ আগস্ট, ২০২৬